রিজার্ভের টানাপোড়েন ও আইএমএফ-এর শর্ত: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের গতিপথ:-
২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ-এর ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণের কিস্তি পাওয়া এবং তার বিপরীতে দেওয়া কঠোর শর্তগুলো এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
১. আইএমএফ কিস্তি ও বর্তমান রিজার্ভের চিত্র
আইএমএফ-এর ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের আগে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা বাধ্যতামূলক।
রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা: আইএমএফ-এর শর্তানুযায়ী নিট আন্তর্জাতিক রিজার্ভ (NIR) একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপরে রাখার চাপ রয়েছে।
কিস্তির গুরুত্ব: এই কিস্তি কেবল ডলারের যোগান বাড়াবে না, বরং বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) থেকে আরও ঋণ পাওয়ার পথ সুগম করবে।
২. সংস্কারের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ (শর্ত যা মানতেই হবে)
আইএমএফ-এর দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলো মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে:
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: খেলাপি ঋণ (NPL) কমানোর জন্য কঠোর আইন কার্যকর করা। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো।
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি: এনবিআর-এর মাধ্যমে ট্যাক্স-টু-জিডিপি (Tax-to-GDP) অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা। করছাড় কমিয়ে করের আওতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
ভর্তুকি প্রত্যাহার ও জ্বালানি মূল্য: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে প্রায়ই বিদ্যুৎ ও তেলের দাম সমন্বয়ের ঘোষণা আসছে।
৩. মুদ্রানীতি ও সুদের হার
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে 'স্মার্ট' (SMART) বা বাজারভিত্তিক সুদহার প্রথা চালু করেছে। টাকার অবমূল্যায়ন রোধে এবং ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল করতে 'ক্রলিং পেগ' (Crawling Peg) সিস্টেমের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
৪. সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
অর্থনৈতিক এই সংস্কারের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক—উভয় দিকই দৃশ্যমান:
ইতিবাচক: দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং বৃদ্ধি।
চ্যালেঞ্জ: ভর্তুকি কমানোর ফলে বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ বাড়ছে, যা সরাসরি মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
এক্সপার্ট অপিনিয়ন: কী আছে সামনের দিনগুলোতে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফ-এর কিস্তি পাওয়া কেবল একটি সাময়িক স্বস্তি। দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য প্রয়োজন বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ। সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মুদ্রাস্ফীতিকে এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনা।
