Top News

আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা: সীমান্ত উত্তেজনার এক চরম পর্যায়

 আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা: সীমান্ত উত্তেজনার এক চরম পর্যায়

তারিখ: ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

স্থান: নানগারহার ও পাক্তিকা প্রদেশ, আফগানিস্তান

গত কয়েক মাস ধরে চলা সীমান্ত উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় ২২ ফেব্রুয়ারি (রবিবার) দিবাগত মধ্যরাতে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী আফগানিস্তানের পূর্ব সীমান্তে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, এটি ছিল সন্ত্রাসবাদ বিরোধী একটি সুনির্দিষ্ট অভিযান, তবে আফগানিস্তান একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পাকিস্তানের দাবি

পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি আত্মঘাতী হামলার জবাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে একটি মসজিদে বোমা হামলা এবং বাজাউরে আত্মঘাতী হামলায় বহু মানুষ নিহতের ঘটনার পর এই 'পাল্টা ব্যবস্থা' নিল পাকিস্তান।


পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী:

 * লক্ষ্যবস্তু: আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP) এবং আইএস-কে (ISKP)-এর অন্তত সাতটি গোপন আস্তানা ও ক্যাম্প লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

 * হতাহতের সংখ্যা: পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, এই অভিযানে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন সশস্ত্র বিদ্রোহী নিহত হয়েছে।

 * যুক্তি: পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান তালেবান সরকার তাদের মাটিতে টিটিপিকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং সেখান থেকেই পাকিস্তানে হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

আফগানিস্তানের প্রতিক্রিয়া ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ

আফগানিস্তানের তালেবান সরকার এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সরকারি মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের এই পদক্ষেপকে "আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিবেশী সুলভ আচরণের চরম লঙ্ঘন" বলে অভিহিত করেছেন।

আফগান পক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:

 * বেসামরিক হতাহত: এই হামলায় কোনো জঙ্গি ঘাঁটি নয়, বরং একটি মাদ্রাসা এবং সাধারণ মানুষের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।

 * পারিবারিক ট্র্যাজেডি: নানগারহার প্রদেশের বিহসুদ (Behsud) জেলায় একটি বাড়িতে হামলায় এক পরিবারেরই ১৬ জন সদস্য নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো (IHRF) নিশ্চিত করেছে।

 * হুঁশিয়ারি: আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, পাকিস্তানের এই আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার অধিকার তারা রাখে এবং সঠিক সময়ে এর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এই ঘটনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ভারত এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে যে, রমজান মাসে বেসামরিক মানুষের ওপর এ ধরনের হামলা কাম্য নয়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি

২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে। গত বছরের অক্টোবর মাসেও দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত যুদ্ধ হয়েছিল। এবারের এই বিমান হামলা দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।


সাম্প্রতিক এই বিমান হামলার পর আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। 

আফগানিস্তানের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ

পাকিস্তানের বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আফগানিস্তানের তালেবান সরকার সীমান্তে তাদের ভারী অস্ত্রশস্ত্র এবং অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করেছে।

 * সীমান্তে গোলাগুলি: খবর পাওয়া গেছে যে, পাক্তিকা এবং খোস্ত প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় (ডুরান্ড লাইন) আফগান সীমান্ত রক্ষীবাহিনী এবং পাকিস্তানি রেঞ্জার্সদের মধ্যে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গোলাগুলি হয়েছে।

 * তালেবানের হুমকি: আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এনায়েতুল্লাহ খোয়ারজমি বলেছেন, "পাকিস্তান যদি মনে করে তারা আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে পার পেয়ে যাবে, তবে তারা ভুল ভাবছে। আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।"

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অবস্থান

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান এক জরুরি বৈঠকে বসেছেন। পাকিস্তান সরকারের অবস্থান স্পষ্ট:

 * জিরো টলারেন্স নীতি: পাকিস্তান জানিয়েছে, তাদের মাটিতে রক্তপাত ঘটানোর জন্য যারা আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।

 * কূটনৈতিক তলব: পাকিস্তান ইতিমধ্যেই ইসলামাবাদে নিযুক্ত আফগান চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া

এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে:

 * জাতিসংঘ (UN): জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দুই পক্ষকেই সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "বেসামরিক নাগরিকদের জানমালের ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।"

 * চীন: পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের মিত্র চীন এই ঘটনায় কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে। বেইজিং দুই দেশকেই আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিয়েছে, কারণ এই অস্থিরতা তাদের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' প্রকল্পের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

 * যুক্তরাষ্ট্র: ওয়াশিংটন জানিয়েছে যে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বললেও আফগান ভূখণ্ডে বেসামরিক লোক নিহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

মানবিক পরিস্থিতি

সীমান্তবর্তী নানগারহার এবং পাক্তিকা প্রদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলো জানিয়েছে যে, আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কারণ অনেক ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ আটকে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল।

Previous Post Next Post
আপনার অঞ্চলের স্থানীয় খবর, ভাগ করেনিন আমাদের সাথে! আপনার ভ্রমণ কাহিনী,আপনার সাহিত্য সৃষ্টি আমাদের সাথে ভাগ করেনিতে WHATSAPP :6289008713