ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার জেরে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) বন্ধ করার হুমকি দেওয়ায় বা আংশিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করায় ভারতের অর্থনীতিতে বড়সড় মেঘ ঘনিয়ে আসছে। বিশ্ব বাণিজ্যের এই 'লাইফলাইন' বন্ধ হলে ভারতের ওপর কী কী প্রভাব পড়তে পারে, তার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে দেওয়া হলো:
বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজি (LNG)-র একটি বড় অংশ এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ভারতের জন্য এই পথটি বন্ধ হওয়া মানে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পকেটে সরাসরি টান পড়া।
১. জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা
ভারত তার প্রয়োজনের প্রায় ৮৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো (ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও কুয়েত) থেকে, যা এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই ভারতে পৌঁছায়।
* তেলের দাম: সরবরাহ বন্ধ বা ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০-১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
* পেট্রোল-ডিজেলের দাম: এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের সাধারণ মানুষের ওপর। দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যেতে পারে।
২. রান্নার গ্যাস বা এলপিজি (LPG) সংকট
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো এলপিজি। ভারত তার মোট এলপিজি চাহিদাই প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ আমদানি করে, যার সিংহভাগই আসে কাতার ও সৌদি আরব থেকে এই পথ দিয়ে।
* এই পথ বন্ধ থাকলে দেশে রান্নার গ্যাসের তীব্র ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩. মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন—ফল, সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম এক লাফে বেড়ে যাবে। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য এটি মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
৪. ভারতের কৌশলগত তেলের ভাণ্ডার (SPR)
ভারতের কাছে বর্তমানে প্রায় ৭৪ দিনের জন্য জরুরি তেলের ভাণ্ডার মজুত রয়েছে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সমাধান নয়। যদি এই পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে ভারতকে বিকল্প পথের সন্ধান করতে হবে অথবা রাশিয়া ও আমেরিকার মতো দেশ থেকে আমদানির পরিমাণ বহুগুণ বাড়াতে হবে, যা অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
৫. রপ্তানি ও লজিস্টিক খরচ
ভারত শুধু তেল আমদানিই করে না, প্রচুর পণ্য মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানিও করে। এই পথ বন্ধ হলে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে আসতে হবে, যার ফলে:
* শিপিং চার্জ বা জাহাজ ভাড়া বাড়বে।
* বীমার খরচ (Insurance premium) কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
* রপ্তানি বাণিজ্যে ভারতীয় পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
এক নজরে প্রভাবের সারণি
| খাত | প্রভাবের ধরন | সম্ভাব্য ফলাফল |
| অশোধিত তেল | আমদানি ব্যাহত | পেট্রোল-ডিজেলের দাম বৃদ্ধি |
| রান্নার গ্যাস (LPG) | তীব্র সংকট | গৃহস্থালির বাজেটে বড় চাপ |
| অর্থনীতি | টাকার মান হ্রাস | ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার পতন |
| শেয়ার বাজার | অস্থিরতা | জ্বালানি ও লজিস্টিক শেয়ারে ধস |
ইরান যদি সত্যিই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তবে ভারতের জন্য তা হবে এক ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তবে ভারত হাত গুটিয়ে বসে নেই। এই ধরনের সংকট মোকাবিলায় ভারত বেশ কিছু বিকল্প কৌশল ও পথ নিয়ে কাজ করছে।
সংকট মোকাবিলায় ভারতের হাতে থাকা বিকল্পসমূহ
এই সংকট এড়াতে ভারত মূলত তিনটি স্তরে কাজ করতে পারে: বিকল্প পথ, বিকল্প উৎস এবং কৌশলগত মজুত।
১. আইএমইসি (IMEC) করিডোর: মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর
ভারত সম্প্রতি India-Middle East-Europe Economic Corridor (IMEC) নিয়ে কাজ শুরু করেছে।
* এই প্রকল্পের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (UAE) থেকে সরাসরি রেলপথে পণ্য সৌদি আরব এবং জর্ডান হয়ে ইজরায়েল ও ইউরোপে পৌঁছানো সম্ভব।
* যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তবে ভারত এই রেলপথ ব্যবহার করে পারস্য উপসাগরের অস্থিরতা এড়িয়ে পণ্য পাঠাতে পারবে।
২. আইএনএসটিসি (INSTC): রাশিয়ার সাথে সংযোগকারী পথ
International North-South Transport Corridor (INSTC) ভারতের জন্য একটি বড় অস্ত্র।
* এটি ভারত থেকে ইরান হয়ে রাশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি মাল্টি-মোডাল পথ।
* হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে ইরানের চাবাহার বন্দর (Chabahar Port) ব্যবহার করে ভারত মধ্য এশিয়া ও রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারবে। ভারত এই বন্দরে বিপুল বিনিয়োগ করেছে যা এই সংকটকালে রক্ষাকবচ হতে পারে।
৩. রুশ তেলের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আসা বন্ধ হলে ভারতের একমাত্র বড় ভরসা হবে রাশিয়া।
* ভারত ইতিমধ্যেই রাশিয়ার কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে ডিসকাউন্টে তেল কিনছে।
* এই তেলের জাহাজগুলো আর্কটিক বা বাল্টিক সাগর হয়ে আসে, যা হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভর করে না। ফলে সংকটের সময় রাশিয়া ভারতের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে।
৪. কৌশলগত তেলের ভাণ্ডার (Strategic Petroleum Reserves - SPR)
জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য ভারতের মাটির নিচে বিশাল তেলের গুদাম রয়েছে।
* বিশাখাপত্তনম, ম্যাঙ্গালোর এবং পদুর—এই তিনটি স্থানে ভারতের বিশাল তেলের ভাণ্ডার আছে।
* যদি আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে ভারত এই ভাণ্ডার থেকে টানা ৯.৫ দিন দেশের চাহিদা মেটাতে পারবে। এ ছাড়া তেল শোধনাগারগুলোতে (Refineries) আরও প্রায় ৬৪ দিনের মজুত থাকে। অর্থাৎ ভারত প্রায় আড়াই মাস তেল ছাড়া টিকে থাকতে পারবে।
৫. আমেরিকা ও আফ্রিকা থেকে আমদানি
ভারত তার আমদানির ঝুড়ি (Import Basket) বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারত এখন:
* মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA)
* নাইজেরিয়া ও গায়ানা
* ব্রাজিল
প্রভৃতি দেশ থেকে তেল আমদানির পরিমাণ বাড়াচ্ছে। এই দেশগুলো থেকে তেলের জাহাজ আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে সরাসরি ভারতে আসে, যেখানে হরমুজ প্রণালীর কোনো ভূমিকা নেই।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও কূটনৈতিক সমাধান
এত বিকল্প থাকলেও, তেলের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ন্ত্রণ করা ভারতের জন্য কঠিন হবে। তাই ভারতের প্রাথমিক কৌশল হবে কূটনীতি।
* ভারত ইরান ও ইজরায়েল—উভয় দেশের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখে।
* ভারত সম্ভবত ওমান বা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশগুলোকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের জাহাজের জন্য 'নিরাপদ করিডোর' নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে।
উপসংহার:
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া মানে ভারতের অর্থনীতির 'ধমনী' চেপে ধরা। ভারত বর্তমানে রাশিয়ার থেকে তেল আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং বিকল্প পাইপলাইন ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। তবে এই উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের মূল লক্ষ্য হবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা।
